যখন গ্যাস্ট্রিক আলসার ও ডিওডিনাল আলসারের কোনটিই সঠিকভাবে বুঝা যায় না, তখন তাকে পেপটিক আলসার ধরা হয়। দীর্ঘদিন যাবৎ পাকস্থলীর প্রদাহে ভুগলে এই রোগ হয়। পাকস্থলীর গাত্রের গ্ল্যান্ড হতে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নামক এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ হয় এবং তা হজমে সহায়তা করে। উত্তেজক খাবার খেলে হাইড্রোক্লোরিক এসিড ও পেপসিন বেশী পরিমাণে নিঃসৃত হয়। খালি পেটে বেশীক্ষন থাকলে এই এসিড পাকস্থলীর অভ্যন্তর ভাগের মিউকাস মেমব্রেনের পাতলা আবরনীর প্রথমে দুই-এক যায়গায় প্রদাহ সৃষ্টি করে। এভাবে বেশীদিন চললে ঐ স্থানে ছোট ক্ষতের সৃষ্টি হয়। চিকিৎসার অভাবে এই আলসার কারো কারো বৃদ্ধি পায়, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায় না। ব্যথায় ২-৪ দিন কষ্ট পাওয়ার পর নিজ থেকেই শুকিয়ে যায় এবং ব্যথা কমে যায়। আবার অনেকের ঘা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
কারণঃ
১। জন্ম থেকে পাকস্থলীর ঝিল্লীর দুর্বলতার জন্য।
২। বংশানুক্রমে আক্রান্ত ব্যক্তির বাপ-মা, ভাই-বোন কারো এই রোগ থাকলে।
৩। স্বাভাবিক অবস্থায় পাকস্থলীর ঝিল্লীর হাইড্রোক্লোরিক এসিড সহ্য করার ক্ষমতা আছে। কারো কারো ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী পরিমাণে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নির্গত হয়, ফলে পাকস্থলীর মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ হয়।
৪। পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসরণ নার্ভের উপর নির্ভর করে। ঐ নার্ভ যত বেশী উত্তেজিত হয়, হাইড্রোক্লোরিক এসিড তত বেশী নিঃসরণ হয়।
৫। বেশী চিন্তাশীল ব্যক্তি, খিটমিটে মেজাজ, মানসিক অস্থির, বদমেজাজী ব্যক্তি এই রোগে বেশী আক্রান্ত হয়।
৬। ভেজাল খাদ্যদ্রব্য খাওয়া, অনিয়মিত আহার কিংবা প্রায়ই বহুক্ষণ যাবৎ খালিপেটে থাকলে পাকস্থলীর গাত্রে প্রদাহ হয় এবং পরবর্তীতে তা ঘায়ে রূপান্তর হয়।
৭। উত্তেজক খাবার যেমনঃ মরিচ, পিয়াজ, পান, চুন, জর্দা, লেবু, চাটনী, ইত্যাদি খেলে হতে পারে।
৮। অতিরিক্ত গরম মসলাযুক্ত খাদ্য, ভাতের সাথে আলাদা মরিচ খেলে, ছোবড়া জাতীয় খাবার ভাল করে চিবিয়ে না খেলে, এই রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে।
৯। প্রায়ই টক বা টক জাতীয় খাবার খেলে।
১০। দাঁতের গোড়ায় দীর্ঘদিন যাবৎ পুঁজ হলে এবং তার জন্য খাবার ভালমত চিবিয়ে না খেলে।
১১। দীর্ঘদিন যাবৎ দুশ্চিন্তা বা মানসিক অশান্তি বা অস্থিরতা থাকলে।
১২। দৈহিক পরিশ্রমের জন্য পাকস্থলীতে পেপসিন ও হাইড্রোক্লোরিক এসিড বেশী উৎপন্ন হলে পেপটিক আলসার হয়।
পেপটিক আলসারের ক্ষতস্থানের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে পেপটিক আলসার দুই প্রকার।
১। গ্যাস্ট্রিক আলসার ( Gastric Ulcer)
২। ডিওডিনাল আলসার ( Duodenal Ulcer)
১। গ্যাস্ট্রিক আলসার ( Gastric Ulcer)
গ্যাস্ট্রিক আলসারের প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণ প্রকাশ পায় না। পাকস্থলী হতে রক্ত নিঃসরণ হলে বা পাকস্থলী ছিন্ন হলে গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ পুরোপুরি প্রকাশ পায়।
লক্ষণঃ
১। খাবার গ্রহনের পর ১/২-২ ( আধ হতে দুই ) ঘন্টার মধ্যে পাকস্থলীতে ব্যথা করে।
২। খাওয়ার পর সাময়িকভাবে ব্যথার উপশম হয়। তবে প্রথম প্রথম খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি ও ভার বোধ হয়, পেট জ্বালা ও বুক জ্বালা করে এবং ঢেকুর উঠে।
৩। সোডিয়াম-বাই-কার্বনেট অর্থাৎ খাওয়ার-সোডা খেলে কিংবা বমি হলে ব্যথা কমে যায়।
৪। বেশীদিন ভোগার পর রোগীর ব্যথা বেশী হলে রোগী বমির চেষ্টা করে। বমির সাথে ভাত ও অল্প পানি বের হয়। তবে রক্ত বমিও হতে পারে, ব্যথা ও বমির ভয়ে রোগী কিছুই না খেয়ে দুর্বল হয়।
৫। মলের সাথে রক্ত থাকতে পারে। ঐ অবস্থায় মল আলকাতরার মত কাল হতে পারে।
৬। রোগী ঘুমালেও ব্যথার জন্য ঘুম থেকে জেগে উঠে।
৭। ব্যথা ২/১ দিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার শুরু হয়।
৮। প্রায়ই বমি হওয়া এবং বমির সাথে রক্ত আসাও গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ।
৯। বেরিয়াম মিল X-ray করলে এই রোগ ধরা পড়ে।
১০। এন্ডোস্কপি করলেও রোগ ধরা পড়ে।
২। ডিওডিনাল আলসার ( Duodenal Ulcer)
১। পাকস্থলীর নিন্মাংশের ক্ষুদ্রান্তের প্রথম অংশকে ডিওডিনাম বলে। এটি প্রায় ১২" (ইঞ্চি) লম্বা। পাকস্থলী যেখানে শেষ সেখান থেকে ডিওডিনাম শুরু। ডিওডিনাম অংশে আলসার হলে তাকে ডিওডিনাম আলসার বলে।
লক্ষণঃ
১। খাবার খাওয়ার ২/৩ ঘন্টা পর ব্যথা আরম্ব হয়।
২। এই ব্যথার স্থান হল নাভির কিছু উপরে পেটের মধ্য লাইনের ডান দিকে।
৩। কিছু খেলে এই ব্যথা কমে।
৪। ব্যথায় রোগী গভীর রাতে ঘুম হতে জেগে উঠে।
৫। সোডিয়াম-বাই-কার্বনেট অর্থাৎ খাওয়ার-সোডা খেলে কিংবা বমি হলে ব্যথা কমে যায়।
৬। বমি কদাচিৎ হয়। তবে বমি হলে তা বেশি পরিমাণে হয়।
৭। বমির সাথে রক্ত পড়ে না। বমির সাথে রক্ত পড়া গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ। ( যেহেতু ডিওডিনাম আলসার হল পাকস্থলীর পরে, তাই ডিওডিনাম হতে বমির সাথে রক্ত যায় না কেননা, বমি ডিওডিনাম হতে হয় না, বমি পাকস্থলী হতে হয়। )
৮। ব্যথা কিছুদিন থেমে থাকে, আবার ২/১ মাস পরে হয়।
গ্যাস্ট্রিক আলসার ও ডিওডিনাল আলসার এর পার্থক্যঃ
গ্যাস্ট্রিক আলসার
|
ডিওডিনাল আলসার
|
১। খালি পেটে আরামে থাকে।
২। খাইলে ব্যথা আরম্ভ হয়।
৩। ব্যথা নাভির উপরে অনুভূত হয়।
৪। আপনা আপনি বমি হয় এবং উপসম হয়।
|
১। খালি পেটে ব্যথা থাকে।
২। খাইলে ব্যথা কমে যায়। তবে ২-৩ ঘন্টা পর ব্যথা আরম্ভ হয়।
৩। ব্যথা নাভির একটু উপরে ডানদিকে অনুভূত হয়।
৪। কদাচিৎ বমি হয়। তবে ব্যথায় গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করলে উপসম হয়।
|
১। রক্তক্ষরণ ( Haemorehage): এই অবস্থায় রক্তপাত এত বেশী হয় যে, রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এর জন্য রক্তপাতের চিকিৎসা করা দরকার হয়। রোগী শীর্ণ ও ফ্যাকাশে হয়।
২। পারফোরেশনঃ দীর্ঘদিন যাবৎ আলসারে ভুগলে পাকস্থলী ছিদ্র হয়ে যায়। অতঃপর ছিদ্রের ভিতর দিয়ে খাবার বের হয়ে পেরিটোনিয়ামে প্রদাহ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন অবস্থায় রোগী মারা যায়। তাই এমন ক্ষেত্রে অস্রপচার ছাড়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
৩। পাইলোরিক স্টেনোসিস (Pyloric Stenosis): পাকস্থলীর উপরের এবং নিচের প্রান্ত সাধারণতঃ সরু হয়। ভুক্ত খাবার এই পথেই পাকস্থলি হতে ক্ষুদ্রান্তে যায়। খাবারের ঐ প্রবেশ পথে আলসার হয়, তাই প্রবেশ পথ আরো সরু হয়ে খাবার প্রবেশের পথ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কোন খাবার ক্ষুদ্রান্তে পৌঁছাতে পারে না এবং খাবার বমি হয়ে বের হয়ে যায়। এই অবস্থার নাম পাইলোরিক স্টেনোসিস। এর ফলে রোগী প্রতিদিন বমি করে, পেটে ব্যথা হয় এবং রোগী দুর্বল হয়। অনেক সময় ২/১ দিন পরে খাওয়া খাদ্য বমির সাথে পচা ও দুর্গন্ধ অবস্থায় দেখাযায়। এমন ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল অপারেশন অপরিহার্য।
৪। গ্যাস্ট্রোজেজুন্যাল আলসার ( Gastrojejunal Ulcer): ডিওডিনাম যেখানে শেষ জেজুনাম সেখানে আরম্ভ। আলসার বেশী দিনের পুরাতন হলে ঘা বড় হয়ে জেজুনাম আক্রমণ করে। পেপটিক আলসারের মতই জেজুনাম আক্রান্ত হয় এবং পেপটিক আলসারের মতই চিকিৎসা। লক্ষণের উপর নির্ভর করে অপারেশনের কথা ভাবতে হয়।
পথ্য ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাঃ রোগী ঔষধ খাওয়ার পর একটু সুস্থ হলে তাকে ঔষধ ও পথ্য নিয়ম মাফিক দীর্ঘদিন চালাতে হবে। প্রথম অবস্থায় লঘু সহজ পাচ্য পথ্য ছাড়া কিছুই দেয়া যাবে না। পরে অবস্থার উন্নতি হলে নরম ভাত ও টাটকা ও ছোট মাছের ঝোল খেতে দেয়া যেতে পারে।
আলসারের রোগীর যা নিষেধঃ
১। খালি পেটে থাকা।
২। উত্তেজক খাবার খাওয়া।
৩। টক জাতীয় খবার খাওয়া।
৪। শাক জাতীয় খাবার খাওয়া।
৫। মদ, চা, ধূমপান ইত্যাদি।
৬। গরুর মাংস, খাশির মাংস, ইলিস মাছ, বোয়াল, গজার, চিংড়ী, পুঁটি ইত্যাদি
৭। পাকা পেঁপে বা পেঁপের তরকারি খাওয়া।
৮। দুঃশ্চিন্তা, অধিক রাত জাগা ও দৈহিক পরিশ্রম।
৯। পান, জর্দা ইত্যাদি খাওয়া যাবে না।
১০। ডাল, টক, দধি, ঝাল, বাসি, তৈলাক্ত বা চর্বি জাতীয় মাছ, মাংস, ভাজা-পোড়া, ও অধিক মসলাযুক্ত খাদ্য খাওয়া নিষেধ।